বামন হয়ে চাঁদে হাত: পালওয়ানকার বালু

আমির খান-অভিনীত ‘লগান’ ছবিটির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? মনে আছে চম্পারণ গ্রামের সেই অচ্ছ্যুৎ যুবক কচড়ার কথা? গ্রামের মানুষের সংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চম্পারণ অধিনায়ক ভুবন দলে নেয় কচড়াকে, এবং ব্রিটিশ দলের বিরুদ্ধে কচড়ার বোলিংয়ের জাদু সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়। কচড়া চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও সেটি ভারতীয় ক্রিকেটের এমন এক নক্ষত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়, যাঁর নাম ও কীর্তির ওপর এক শতাব্দীর জমা ধুলো আধুনিক ক্রিকেটভক্তের কাছে তাঁকে করে তুলেছে বিস্মৃতপ্রায়। আজকে তাঁরই কথা অংশুমান চ্যাটার্জীর কলমে।

baloo1ভারতবর্ষে ক্রিকেটের ইতিহাস বেশ পুরনো। সেই অষ্টাদশ শতাব্দীতে ক্যালকাটা ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাব (সিসিএফসি) প্রতিষ্ঠা হওয়া থেকেই বলা যেতে পারে ভারতে সংগঠিত ভাবে ক্রিকেট খেলার শুরু। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে ক্রিকেটকে ভারতবর্ষের প্রধান খেলা বললে তা অত্যুক্তি হয় না। এখন যদি আপনাকে ভারতের কিছু মহান ক্রিকেটারদের নাম বলতে বলা হয়, আপনি গড়গড় করে আউড়ে যাবেন শচীন, কপিল, গাভাস্কার, কুম্বলে, বেদী-প্রসন্ন-চন্দ্রশেখরদের নাম। না, আপনি ভুল নন। ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এনাদের অবদান অতুলনীয়। কিন্তু ভারতের প্রথম মহান ক্রিকেটারের নাম যদি জিজ্ঞাসা করি? কার নাম করবেন? সিকে নাইডু? বিনু মাঁকড়? পতৌদি? গাভাস্কার? আলোচনায় উঠে আসবে একাধিক নাম, কিন্তু দেখবেন, একটি নাম কখনো কারোর মনে আসবে না। সেই নাম প্রায় হারিয়ে গেছে আধুনিক ক্রিকেটভক্তের মন থেকে। সেই নাম পালওয়ানকার বালু।

বালুর জন্ম ১৮৭৬ সালের উনিশে মার্চ, কর্ণাটকের ধারওয়াড় জেলার পালওয়ান গ্রামের ‘চামার’ (বা চর্মকার) সম্প্রদায়ের এক দলিত পরিবারে। দুঃখিত, দলিত নয়, অচ্ছুৎ; তখন এই নামেই ডাকা হতো ভারতীয় সমাজের এই নিম্নতম শ্রেণীর মানুষদের। প্রথম যৌবনে বালু ছিলেন পুণায় পার্সীদের একটি ক্লাবের মালি। পিচ বানানো, ঝাঁটপাট দেওয়া, নেট খাটানো, এই ছিল তাঁর কাজ; এছাড়াও মাঝেমধ্যে ক্লাবের সভ্যদের ব্যাটিং অনুশীলনের সময় বাঁ-হাতে স্পিন বলও করতেন। এরপর বালু মালির চাকরি পান পুণারই আরেকটি ক্লাবে, নাম ‘পুণা ক্লাব’। খাঁটি ইউরোপীয়ানদের ক্লাব, ক্রিকেটের ব্যবস্থা আরো জবরদস্ত।

এই পুণা ক্লাবেরই এক সদস্যের (নাম মিস্টার ট্রস) চোখে পড়ে বালুর বোলিং প্রতিভা। তাঁর উৎসাহে বালু ইউরোপীয়দের নেট প্র্যাক্টিসের সময় ধারাবাহিকভাবে বোলিং শুরু করেন। এই সময় পুণা ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ক্যাপ্টেন জন গ্লেনি (ওরফে ‘জংলী’) গ্রেগ। ক্যাপ্টেন গ্রেগ ছিলেন ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ ব্যাটসম্যানদের মধ্যে অন্যতম। ১৮৯৩-৯৪-এর বোম্বে প্রেসিডেন্সি ম্যাচে তিনি ইউরোপীয়দের হয়ে প্রথম খেলেন, ও অচিরেই নিজের প্রতিভার ছাপ রেখে যান। গ্রেগ পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির হয়েও খেলেন। রতনে রতন চেনে, গ্রেগ ও চিনলেন বালুর প্রতিভাকে। গ্রেগ দেখলেন যে নিজের খেলাকে ঘষামাজা করার এমন সুযোগ তিনি কমই পাবেন। তাই বালুকে দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বোলিং করাতে লাগলেন নেটে। চ্যালেঞ্জ করলেন বালুকে, যে যতবার বালু গ্রেগকে আউট করতে পারবেন, ততবার আট আনা করে পাবেন। দীন বালু উপরি রোজগারের আশায় লেগে পড়লেন বোলিংয়ে, ও গ্রেগের মাপের ব্যাটসম্যানকে টেক্কা দিতে দিতে নিজের বাঁ-হাতি স্পিন বোলিংকেও আরো ক্ষুরধার করে তুলতে লাগলেন। বলাই বাহুল্য, এতো বোলিং করেও বালু কোনোদিন নেটে ব্যাটিং করার আমন্ত্রণ পাননি; সেটা যে সাহেবসুবোদের ও উঁচু জাতের ভারতীয়দের কুক্ষিগত ‘অধিকার’।

baloo2_greig
জনি গ্লেন ‘জংলী’ গ্রেগ (কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ http://www.cricketcountry.com)

 

এই সময় পুণার হিন্দুরা ইউরোপীয়দের চ্যালেঞ্জ জানালেন একটি ক্রিকেট ম্যাচ খেলার। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো বালুকে নিয়ে। হিন্দু দলের ব্রাহ্মণরা কোনোমতেই রাজি নন একজন অচ্ছ্যুতের সাথে খেলতে, অথচ বালুর বোলিং ছাড়া ইউরোপীয়দের হারানো প্রায় অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত হিন্দু দলের কিছু তেলেগু সদস্যদের ও সর্বোপরি ক্যাপ্টেন গ্রেগের মধ্যস্থতায় ঠিক হয় যে বালু পুণার হিন্দুদের হয়ে খেলবেন। এবং প্রধানত বালুর কেরামতিতেই পুণার হিন্দুরা ইউরোপীয়দের হারাতে সক্ষম হন। এর পর থেকে বালু হিন্দুদের হয়ে ধারাবাহিকভাবে খেলতে থাকেন, ও ওনার প্রতিভার খবর স্বাভাবিকভাবেই দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এতো কিছুর পরেও কিন্তু বালুর সামাজিক অবস্থানের কোনো পরিবর্তন ঘটলো না। অচ্ছ্যুৎ পরিবারে জন্মানোর বোঝা বালুর ঘাড়ে চেপেই রইলো। মাঠে একসাথে খেললেও মাঠের বাইরে একঘরেই হয়ে রইলেন বালু। প্যাভিলিয়নে দলের বাকি সদস্যদের সাথে বসা, খাওয়া-দাওয়া করা, এসবের অধিকার ছিল না বালুর। তিনি বসতেন মাঠের বাইরে একাকী, খেতেন ওনার জন্য রাখা আলাদা থালা-বাটিতে, চা খেতেন চায়ের ভাঁড়ে। এতো কিছু সত্বেও দমিয়ে রাখা যায়নি বালুকে; তিনি একের পর এক ম্যাচে দলকে জিতিয়ে সকলের নজর কাড়তে থাকেন। ধীরে ধীরে সামাজিক বাধাগুলিও শিথিল হতে থাকে, ও বালু একদিন দলের উচ্চবর্ণ সদস্যদের সাথে প্যাভিলিয়নে বসার অধিকারও ছিনিয়ে নেন।

যখন বালুর নাম সারা ভারতে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন, ১৮৯৬ সালে, উনি সপরিবার চলে আসেন বোম্বাই শহরে, কারণ বোম্বাইয়ে ক্রিকেটের সুযোগ পুণার তুলনায় অনেকাংশে বেশি (কিছুটা পুণায় বাড়তে থাকা প্লেগের প্রকোপের জন্যও)। বোম্বাইয়ে এসে বালু যোগ দেন পরমানন্দদাস জীবনদাস হিন্দু জিমখানা ক্লাবে, ও সেন্ট্রাল রেলওয়েতে চাকরি নেন। এই হিন্দু জিমখানা ক্লাবেও পুণার মতোই বালুকে অস্পৃশ্যতার বাধা টপকে দলে জায়গা বানাতে হয়। তবে বোম্বাইয়ের এই ক্লাবটি পুণার হিন্দু দলের থেকে বেশী আপন করে নেয় বালুকে। অপাঙ্ক্তেয় বালুর সাথে একাসনে বসে খাওয়া-দাওয়াও শুরু হয় এই হিন্দু জিমখানা ক্লাবেই। হিন্দু জিমখানা ক্লাবে বালুর অন্তর্ভুক্তি যেন ক্লাবের একটা বহুযুগের বন্ধ দরজা খুলে দেয়। পরে যখন বালুর তিন ভাই (শিবরাম, বিটঠল, ও গণপত) হিন্দু জিমখানা ক্লাবে অন্তর্ভুক্ত হন, তাঁদেরও সাদরে আপন করে নেয় হিন্দু জিমখানা।

হিন্দু জিমখানার হয়েই ৮ই ফেব্রুয়ারী, ১৯০৬, বোম্বের ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে পালওয়ানকার বালুর। এবং মূলতঃ বালু ও পি.এ. এরাশার বোলিংয়ে ভর করেই হিন্দু জিমখানা ১০৬ রানে হারিয়ে দেয় ইউরোপীয়দের। এই জয় যে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় পরের বছর, যখন আবার হিন্দু জিমখানা পরাস্ত করে ইউরোপীয়দের, এবার ২৩৮ রানে। এবার বালু আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন; দুই ইনিংসে তাঁর বোলিংয়ের হিসাব ছিল ৩১.২-১২-৫৭-৭ ও ১৯-৩-৪৪-৬। পরপর দুই বছর ভারতীয় হিন্দুদের হাতে ইউরোপীয়দের তাদেরই আবিষ্কৃত খেলায় এই পরাজয়ের খবর গোটা দেশে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে নিপীড়িত ভারতীয়দের সংঘবদ্ধ উত্থানের ছবি হিসাবে এই জয়গুলি তৎকালীন স্বদেশী আন্দোলনে প্রভাব তো ফেলেই, তার সঙ্গে বালুর উপস্থিতি ও চোখধাঁধানো স্পিন বোলিং অচ্ছুৎ শ্রেণীর মানুষদের লড়াইয়ের রূপক হিসাবেও ফুটে ওঠে।

baloo3_natore team
নাটোরের মহারাজার ক্রিকেট দল, বালু মাঝের সারিতে বসে একদম বাঁদিকে (কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ http://www.outlookindia.com)

হিন্দু জিমখানার হয়ে ধারাবাহিক ভালো খেলার সুবাদে বালু রাজারাজড়াদের সুনজরে পড়তে শুরু করেন। নাটোরের মহারাজা, শ্রী জগদীন্দ্রনারায়ণ রায়, বালুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসেন বাংলায় তাঁর ক্রিকেট দলের কোচ হিসাবে। ১৯১১ সালে পাতিয়ালার মহারাজা ভূপিন্দর সিংহের নেতৃত্বে একটি ‘অল ইন্ডিয়া’ দল ইংল্যান্ড সফরে যায়; সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন পালওয়ানকার বালু। সেই সফরে ‘অল ইন্ডিয়া’ সাকুল্যে ২৩টি ম্যাচ খেলে, যার মধ্যে ১৪টি প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা পায়। এই ১৪টি ম্যাচের মধ্যে ‘অল ইন্ডিয়া’ জেতে মাত্র দুটিতে (লেস্টারশায়ার ও সমারসেটের বিরুদ্ধে), হারে ১০টি, ও দুটি ম্যাচ ড্র হয়। যদিও নিরপেক্ষভাবে দেখলে দলগত ভাবে ‘অল ইন্ডিয়া’র এই সফর ব্যর্থ হিসাবেই গণ্য হয়, তবুও ১৯১১ সালের নিরিখে একটি ভারতীয় দলের পক্ষে ক্রিকেটের জন্মভূমিতে গিয়ে দুটি জয় ছিনিয়ে আনাও কম কথা ছিল না। পালওয়ানকার বালু এই দুটি জয়েই বড় ভূমিকা পালন করেন: লেস্টারশায়ারের বিরুদ্ধে ম্যাচে সাকুল্যে ১১টি উইকেট নেন মাত্র ১৮৫ রানের বিনিময়ে, ও সমারসেটের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে ৪/৪৮ নেওয়ার পর চতুর্থ ইনিংসে যখন ২৬৫ রান তাড়া করে ১ উইকেটে রুদ্ধশ্বাস জয় ছিনিয়ে নেয় ‘অল ইন্ডিয়া’, তখন বালু ৫৫ রানের একটি অমূল্য ইনিংস খেলে জয়ের প্রধান কারিগর পালওয়ানকার শিবরামকে (১১৩*) যোগ্য সঙ্গত দিয়ে যান। গোটা সফরে শুধু প্রথম শ্রেণীর ম্যাচগুলিতেই বালু ৭৫টি উইকেট পান (বোলিং গড় ২০.১২), ও সব মিলিয়ে পান ১১৪টি উইকেট; ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ৮/১০৩ ছিল তাঁর সেরা পারফরম্যান্স। শোনা যায়, বিভিন্ন কাউন্টি থেকে বালুকে ইংল্যান্ডে থেকে তাঁদের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যদিও বালু কোনো কাউন্টির প্রস্তাবেই রাজি হননি। বিলেতের মাটিতে এহেন পারফরম্যান্স পালওয়ানকার বালুকে দেশের অচ্ছ্যুৎ শ্রেণীর মানুষদের চোখে এক লোকগাথার নায়কের রূপ দেয়। শোনা যায়, বালুর কীর্তিকলাপ ভীমরাও রামজি আম্বেদকর নামে জনৈক দলিত তরুণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

baloo4_1911
১৯১১ সালের ইংল্যান্ড-সফরকারী ‘অল ইন্ডিয়া’; বালু পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে একদম ডানদিকে (কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ Rustom Deboo)

১৯১২ সালে শুরু হয় ইউরোপীয়ান, হিন্দু, পার্সী, ও মহামেডান দলগুলির মধ্যে বোম্বের বিখ্যাত কোয়াড্র্যাঙ্গুলার টুর্নামেন্ট (অর্থাৎ চতুর্মুখী প্রতিযোগিতা)। বালু ও তাঁর তিন ভাই (শিবরাম, বিটঠল, ও গণপত) হিন্দু দলের স্তম্ভ হয়ে ওঠেন। দলের অন্যতম অভিজ্ঞ ও সেরা খেলোয়াড় হিসাবে এই সময় বারবার বালুর নাম প্রস্তাবিত হতে থাকে অধিনায়ক পদের জন্য। কিন্তু অদৃষ্টের লিখনে বালু যে অচ্ছ্যুৎ, নীচু জাত। উচ্চবর্গীয় হিন্দুদের সাথে একসঙ্গে খেলার অধিকার দেওয়া হয়েছে নিম্নবর্গীয় বালুকে, তাই কি যথেষ্ট নয়? বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে চান বালু? সমাজের মাথা যে ব্রাহ্মণরা, সেই ব্রাহ্মণ খেলোয়াড়দের নেতৃত্ব দেবেন ‘চামার’ বালু? তাই কখনো হয়? হিন্দু জিমখানার কর্তারা তাই বিলেতজয়ী বালুর বদলে অধিনায়কত্বের দায়ভার তুলে দেন ব্রাহ্মণসন্তান মুকুন্দরাও পাইয়ের হাতে।

১৯২০ সালে বালুর ভাই গণপত মারা যান। সে বছর অধিনায়ক পাইয়ের অসুস্থতার কারণে সহ-অধিনায়ক বালুর বদলে আরেক ব্রাহ্মণসন্তান দিনকর বলবন্ত দেওধরকে (যাঁর নামে আজকের দেওধর ট্রফি) অধিনায়ক ঘোষণা করে হিন্দু জিমখানা। এবং দেওধর অধিনায়কত্ব পেয়েই মহামেডানের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচের দল থেকে সরিয়ে দেন বিগত আট বছর ধরে দাপটের সাথে কোয়াড্র্যাঙ্গুলার টুর্নামেন্ট খেলা বালুকে; দোহাই দেওয়া হয় তাঁর বয়সের। এর প্রতিবাদে দল থেকে সরে দাঁড়ান বালুর অন্য দুই ভাই, শিবরাম ও বিটঠল। তিন প্রধান তারকার না খেলা মেনে নিতে পারেননা হিন্দু জিমখানার সাধারণ সভ্য ও সমর্থকরা। তাঁদের সম্মিলিত প্রতিবাদের চাপে পার্সীদের সাথে ম্যাচের আগে দেওধরসাহেব অপসারিত হন, ও অধিনায়ক পদে ফিরে আসেন মুকুন্দরাও পাই। পাই দলে ফিরিয়ে আনেন তিন পালওয়ানকার ভাইকেই। ১৯২০’র ৬-৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হিন্দু বনাম পার্সী ম্যাচটিই হয় পালওয়ানকার বালুর প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে শেষ ম্যাচ। শেষ ম্যাচে কোনো উইকেট নিতে পারেননি বালু, কিন্তু বহুকালের সাথী পাইয়ের বদান্যতায় শেষ ম্যাচে তিনি শেষ পর্যন্ত বামন হয়েও চাঁদে হাত দিতে পেরেছিলেন। শেষ দিনের খেলায় মুকুন্দরাও পাই স্বেচ্ছায় দলের দায়ভার সহ-অধিনায়ক বালুর হাতে তুলে দিয়ে বিশ্রাম নেন, যার ফলে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট জীবনের শেষ দিনে ‘চামার’ পালওয়ানকার বালু সুযোগ পান তাঁর উচ্চবর্গীয় হিন্দু সহখেলোয়াড়দের নেতৃত্ব দেওয়ার।

পরিশিষ্ট: পালওয়ানকার বালু প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৩৩টি ম্যাচে ১৭৯টি উইকেট নেন (গড় ১৫.২১)। এছাড়া তিনটি অর্ধশতরান সহ বালু ৭৫৩ রানও করেন। তাঁর অবসরের তিন বছর পর, ১৯২৩ সালে, গান্ধীজির বর্ণাশ্রমপ্রথা-বিরোধী আন্দোলনের স্রোতে হিন্দু জিমখানা এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে কোয়াড্র্যাঙ্গুলার টুর্নামেন্টের জন্য বালুর ভাই পালওয়ানকার বিটঠলকে হিন্দু দলের অধিনায়ক মনোনীত করেন। এর কয়েকমাস পরেই শুরু হয় বর্ণাশ্রম প্রথার বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিটঠলের মনোনয়ন শুধু ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে নয়, ভারতের আর্থ-সামাজিক ইতিহাসেও এক বিরাট পদক্ষেপ ছিল। বালুও এইসময় থেকেই ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ও অচিরেই ভারতের দলিত রাজনীতির এক মুখ্য নাম হয়ে ওঠেন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s