কলকাতা নাইট রাইডার্স

গত আট বছরে আইপিএলে ওঠাপড়া দেখলে একটা কথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে আইপিএল মানেই হল একের পর এক বিতর্কিত নাটকীয় ঘটনা। আর এই আইপিএলের সবচেয়ে নাটকীয় দল যে কলকাতা নাইট রাইডার্স সে বিষয়েও সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। সে শাহরুখ খানের লাফঝাঁপই হোক কিম্বা খেলার হারজিত, নাইট রাইডার্স মানেই বৈচিত্র আর উত্তেজনা। প্রথম তিন বছরের ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে দিয়ে কলকাতা গত চার বছরে দুবার চ্যাম্পিয়ান! দলে বিশেষ বড় নাম না থাকলেও টি-২০ ক্রিকেটের কিছু দারুণ ইউটিলিটি খেলোয়াড় আর অল-রাউন্ডারদের নিয়ে কিভাবে ম্যাচ জিততে হয় কেকেআর সেটা বার বার দেখিয়েছে।

kkr-squad-ipl-2016
photo source: top10wala.in

দলটা বিশ্লেষণ করে দেখুন না। এই মুহূর্তে ভারতীয় দলের নিয়মিত খেলোয়াড় কেউ নেই। হয় গৌতম গম্ভীর, ইউসুফ পাঠান, পীযূষ চাওলাদের মত প্রাক্তন ভারতীয় দলের খেলোয়াড় বা রবিন উথাপ্পা, মনীশ পান্ডে বা উমেশ যাদবের মত অনিয়মিত কিছু খেলোয়াড়। কিন্তু নৈপুণ্য এবং দায়বদ্ধতার দিক দিয়ে এরা কোনভাবেই পিছিয়ে নেই। যদিও নাইট রাইডার্সের প্রধান শক্তি তাদের বিদেশী খেলোয়াড়রা। সাকিব-আল-হাসান আর আন্দ্রে রাসেল এই মুহূর্তে বিশ্বের প্রথম পাঁচ অল-রাউন্ডারের মধ্যে হেসেখেলে চলে আসেন। সঙ্গে আছেন এ বছরের বিগ ব্যাস লিগে সবচেয়ে বেশী রানকারী ক্রিস লিন, নিউজিল্যান্ডের দুরন্ত ব্যাটসম্যান কলিন মুনরো। ফাস্ট বোলারদের মধ্যে মর্নি মর্কেলের ফিটনেস খেয়াল রেখে এ বছরের নিলাম থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে জন হেস্টিংস আর জেসন হোল্ডারকে।

এর পর আসি কেকেআরের বিদেশী স্পিনারদের কথায়। এক দিকে জাদুকর সুনীল নারিন, গত দু বছরের বোলিং অ্যাকশান সংক্রান্ত সমস্ত বিতর্ককে পেছনে ফেলে ফিরে আসার জন্য খেটে চলেছেন, যদিও টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে তাঁর বাবার মৃত্যু তাঁর এবং তাঁর পরিবারের জন্য বিরাট ধাক্কা। অন্যদিকে আছেন ব্র্যাড হগ, এই ৪৫ বছর বয়সেও তাঁর অর্দ্ধেক বয়সী বোলারদের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন। সব শেষে আসি দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ খেলোয়াড়দের দিকে। চায়নাম্যান বোলার কুলদীপ যাদব এর আগে ২০১৪র চ্যাম্পিয়ান্স লিগ টি২০তে নজরে পড়লেও এবারের আইপিএল তাঁর ব্রেক-অ্যাওয়ে সিজন হতেই পারে। এছাড়া জয়দেব উনাদকট এবারের রঞ্জির অন্যতম সেরা বোলার, পুরনো টিমে ফিরে এসে নিজেকে আবার প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন তিনি। এছাড়া মনন্‌ শর্মা, অঙ্কিত রাজপুত বা শেল্ডন জ্যাকসনরা সুযোগ পেলে চেষ্টা করবেন নিজেদের প্রতিভার ছাপ রাখার।

প্রথমেই যেমন লিখেছি নাইট রাইডার্সের গতবারের সিজনেও নাটকের অভাব ছিল না। ইডেনে নিজেদের শেষ ম্যাচে পাঞ্জাবকে এক উইকেটে হারিয়ে গ্রুপের শীর্ষে চলে গেছিল কেকেআর। আইপিএলের ইতিহাসে সেটাই প্রথম এক উইকেটে জয়। কিন্তু তারপর পর পর দুটো অ্যাওয়ে ম্যাচে পাঁচ আর নয় রানে হেরে শেষ অবধি এক পয়েন্টের জন্য রাজস্থানের তলায় পাঁচ নম্বরে শেষ করে তারা। মজার কথা হল, এই রাজস্থান রয়্যালের সঙ্গেই ইডেনে কেকেআরের ম্যাচ বৃষ্টির জন্য ভেস্তে যাওয়ায় পয়েন্ট ভাগাভাগি হয়েছিল। কে বলতে পারে হয়তো ঐ ম্যাচের পুরো পয়েন্ট পেলে কেকেআরই চলে যেতে পারত প্লে-অফে!

যাই হোক, আগের বছরে কী হলে কী হত সেই নিয়ে সময় নষ্ট না করে আমরা দেখে নেব এ বছরের কেকেআর দল কেমন নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে। স্পিন এখনো তাদের শক্তি। হগ, চাওলা, কুলদীপ, সাকিব, ইউসুফ এবং নারিন, বৈচিত্রের অভাব নেই। তবে অন্যান্যবারের চেয়ে এবছরে পিচ যদি আলাদা হয়ে যায় তাহলে স্পিনাররা অতটা সাহায্য হয়তো পাবেন না। অন্যদিকে কেকেআরের দুর্বলতা তাদের লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং। আধুনিক ক্রিকেটে পাওয়ার হিটারদের রমরমার যুগে কলকাতার ভরসা শুধু রাসেল আর ইউসুফ। যদিও মনীশ, রবিন এবং সূর্য্য তিনজনেই ঘরোয়া ক্রিকেটে বেশ ভালো ফর্মে আছেন কিন্তু তাঁরা তাঁদের ফর্ম কতটা আইপিএলে নিয়ে আসতে পারবেন তার ওপর কেকেআরের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে।

এ বছরের আর এক উল্লেখযোগ্য বিষয় হল কেকেআরের কোচ বদল। ট্রেভর বেইলিসের মত একজন সফল কোচের বিদায় যেকোন দলের ভারসাম্যকেই নাড়িয়ে দেয়। যদিও কেকেআরের নতুন কোচ জ্যাক কালিস গত পাঁচ বছর ধরে এই দলের সঙ্গে যুক্ত। সব খেলোয়াড়কেই চেনেন, তাদের সম্বন্ধে জানেন। সেদিক দিয়ে হয়তো তাঁর সুবিধা হবে। যদিও সেরকম কোন বড় দলকে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। সেদিকে দিয়ে কেকেআর সমস্যায় পড়তেও পারে। কালিসকে সাহায্য করতে অ্যাসিসট্যান্ট কোচ হিসেবে আসছেন সাইমন ক্যাটিচ। দেখা যাক কালিস-ক্যাটিচ জুটি নাইট রাইডার্সের জন্য কী ম্যাজিক দেখাতে পারে!

বর্তমান ফর্মের বিচারে কেকেআরের প্রথম দল গড়তে গেলে দেখা যাবে অধিকাংশ স্থানেই একাধিক খেলোয়াড় তৈরি আছেন যারা দলে নিজেদের জায়গা নিয়ে প্রতিযোগীতায় নামতে পারেন। একটা দলের ক্ষেত্রে এটা খুবই ভালো দিক। ওপেন করতে অবশ্যই আসবেন গম্ভীর এবং উথাপ্পা; তিন নম্বরে মনীশ পান্ডে, চার নম্বর জায়গা নিয়ে লড়াই হবে কলিন মুনরো এবং ক্রিস লিনের মধ্যে। পাঁচ-ছয়ে দুই অল-রাউন্ডার সাকিব এবং ইউসুফ। সাতে আসতে পারেন সূর্য্য কিম্বা সথিশ, যিনি বলও করতে পারেন। আটে রাসেলের জায়গা নিয়ে প্রশ্ন নেই। নয় থেকে এগারোয় আসবেন পীযূষ, কুলদীপ, উমেশ, উনাদকটের মধ্যে যেকোন দুজন ভারতীয় এবং নারিন, মর্কেল, হেস্টিংস, হোল্ডার বা হগের মধ্যে একজন বিদেশী। বলেছিলাম না, এই দলে একই পজিশানের জন্য রয়েছে বিভিন্ন খেলোয়াড়। সুতরাং খেলার দিনে পিচ এবং পরিবেশ দেখে বিভিন্ন কম্বিনেশানের মধ্যে থেকে সঠিক দলটিকে বেছে নেওয়াই কলকাতার টিম ম্যানেজমেন্টের চ্যালেঞ্জ।

প্রতিবারের মত এবারেও আইপিএল শুরুর আগে কেকেআর ফেভারিট দলগুলোর মধ্যে পড়ছে না কিন্তু যদি তাদের খেলোয়াড়েরা নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেন তাহলে কিন্তু অনেক হিসেব পালটে দিতে পারে কেকেআর, হ্যাঁ নাটকীয়ভাবেই!

~তপোব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি সৌজন্যেঃ iplt20prediction2016.com

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s