রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরঃ চাঁদের হাট

গার্ডেন সিটি ব্যাঙ্গালোরের চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে, প্রায় ৫০,০০০ দর্শকের সমর্থনে, ঝকঝকে ফ্লাডলাইটের আলোয় মাঠে নামবে আসন্ন আইপিএলের সবচেয়ে বেশী তারকাখচিত দল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর। লাল/সবুজ জার্সিধারীদের এই টীমে আছে আধুনিক ক্রিকেট জগতের সবচেয়ে বড় নামেরা। কাকে ছেড়ে কার কথা বলব! এই মুহূর্তে লিমিটেড ওভার ক্রিকেটের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাট বিরাট কোহলী, নিজের দিনে পৃথিবীর যে কোন বোলিং শক্তিকে নির্মম ভাবে তছনছ করে দেওয়া ক্রিস গেইল, ক্রিকেটের মিস্টার ‘থ্রি-সিক্সটি’ এ বি ডেভিলিয়ার্স, ব্যাটে-বলে সমান ক্ষিপ্র শেন ওয়াটসন, আবার নিয়ন্ত্রিত বোলিং এর শেষ কথা মিচেল স্টার্ক। দলটির সাপোর্ট স্টাফও বেশ ভারী নামে ঠাসা- ড্যানিয়েল ভিত্তরি কোচিং দায়িত্বে, সঙ্গ দেবেন ‘সাদা বিদ্যুৎ’ অ্যালান ডোনাল্ড-ভরত অরুন-ব্রিজেশ প্যাটেলরা। খাতায় কলমে বিরোধী দলগুলিকে ভয় পাওয়ানোর মত সমস্ত রসদ এককাট্টা করে এবারের প্রতিযোগিতায় নামছে ইউনাইটেড স্পিরিটস লিমিটেড-ডিয়াজিওর মালিকানাধীন এই দলটি। গত টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় এলিমিনেটরে চেন্নাই সুপারকিংসের কাছে হেরে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গ হয় ‘রেড ডেভিলস’ দের। এর আগে ২০০৯ ও ২০১১র আইপিএলের ফাইনাল খেললেও আইপিএলের ট্রফিটা এখনো তাদের কাছে অধরা। প্রতিপক্ষকে দুরমুশ করে এই টুর্নামেন্টে দাদাগিরি দেখানোর সম্ভাবনা জাগিয়ে আগামী ১২ই এপ্রিল সানরাইজারস হায়দ্রাবাদের বিপক্ষে অভিযান শুরু করছেন কোহলী-এবি রা।

RCB-Team-for-IPL-2016
photo source: http://www.ipllivescore2016.com

 

এবার আসি দলটির সামগ্রিক বিশ্লেষণে। এবারের নিলামে তারা তুলে নিয়েছেন শ্যেন ওয়াটসন, স্টুয়ার্ট বিনি, ট্রাভিস হেড, কেন রিচার্ডসন, সচিন বেবী, গত আইপিএলের প্রতিশ্রুতিমান ইকবাল আবদুল্লাকে। সঙ্গে আনকোরা মু্খ বিক্রমজিত মালিক, বিকাশ তোকাস, অক্ষয় কারনেওয়ার, প্রবীণ দুবে।তবে এবারের নিলামে দলটির সবচেয়ে বড় পাওনা বোধহয় এই মুহূর্তে টি-২০র এক নম্বর বোলার স্যামুয়েল বদ্রি, মাত্র ৫০ লক্ষ টাকায় কিনে নেওয়া এই বোলারটির দুর্ধর্ষ ফর্ম এবারের আইপিএলে দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি। ভারতীয় পিচে অনেক ব্যাটিংকেই কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলবে বদ্রি। নিলামের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শিকারও এবার এদেরই, অস্ট্রেলিয়ার সদ্য অবসর নেওয়া অলরাউণ্ডার শেন ওয়াটসনকে তারা কিনেছেন প্রায় সাড়ে ন’কোটি টাকায়। নিলামের পরে সানরাইজারসদের থেকে দলবদল করিয়েছেন ভারতীয় দলের উঠতি প্রতিভা কে.এল. রাহুল এবং জম্মু-কাশ্মির রঞ্জি দলের অধিনায়ক পারভেজ রাসুলকে। এদের মধ্যে একজনের কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন ২৩ বছর বয়সী অক্ষয় কারনেওয়ার, ঘরোয়া ক্রিকেটে গতবছর বিদর্ভের হয়ে অভিষেক ঘটে ছেলেটির। মোটামুটি ভালো লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান। কিন্তু অক্ষয়ের বৈশিষ্ট, বাজারের ভাষায় যাকে ইউএসপি বলে, সেটা হল তার সব্যসাচী বোলিং। অক্ষয় ডানহাতে অফস্পিন করেন, আবার বোলিংএ বৈচিত্র্য আনার জন্যে মাঝওভারে বাঁ হাতেও বোলিং করতে সক্ষম এবং অবশ্যই বিরাটের অনেক কাজ সহজ করে দেবেন এমনটা আশা করাই যায়।

এতো গেলো এবারের নিলামের কথা। এছাড়াও দলে রয়েছেন গত আইপিএলে নাইটদের বিরুদ্ধে অভাবনীয় ১৮ বলে ৪২ নট আউটের ইনিংস খেলা ও দুর্দান্ত ফিল্ডার মনদীপ সিং, যিনি আবার পঞ্চম আইপিলের সেরা উঠতি প্রতিভা নির্বাচিত হয়েছিলেন। থাকছেন বিগত বছরগুলিতে অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠা লেগ স্পিনার যজুবেন্দ্র চাহাল। গত জিম্বাবয়ে সিরিজে ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়ে শতরানকারী এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের বর্ষীয়ান ক্রিকেটার কেদার যাদব। দক্ষিন আফ্রিকার অলরাউণ্ডার ডেভিড উইজা এবং নিউজিল্যান্ডের দ্রুতগতির তরুন তুর্কী অ্যাডাম মিলনেও বেঞ্চে থাকবেন। প্রয়োজনে এরা দুজন কিন্তু টি-২০ তে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য। দলটির ভারতীয় পেস বোলিং আক্রমন তুলনামুলক ভাবে একটু দুর্বল, বলা ভালো অনভিজ্ঞ। বরুন অ্যারন এবং আবু নেচিম আহমেদ গত আইপিএলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে যথেষ্ট খরুচে ছিলেন রান দেওয়ার ব্যাপারে। তবে হর্শাল প্যাটেলের ডেথ ওভার বোলিং গতবার অনেক সময়ই খুব প্রয়োজনীয় প্রমাণিত হয়েছে। আশা করা যায় এবারও হর্শাল মাঝের ওভার গুলিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নেবেন।সঙ্গে থাকবেন শ্রীনাথ অরবিন্দ, এই বাঁ হাতি বোলারটির বৈচিত্র্য এবং ফর্ম কোহলীর অনেক মুশকিল আসান করে দিতে পারে। সবশেষে যার কথা না বললেই নয়, দলের কনিষ্ঠতম সদস্য ১৯ বছরের সরফরাজ খান। সদ্য শেষ হওয়া যুব বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন- ৬ টি বিশ্বকাপ ম্যাচের ৫ টি তেই অর্ধশতরান করেছেন, গড় ৭১.০০! সরফু কিন্তু দরকারে লেগস্পিনটাও করে দিতে পারে এবং শেষের ওভার গুলিতে মনদীপ বা এবি র সাথে তাল মিলিয়ে দ্রুত রান করার অন্যতম ভরসা। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর দলটির অন্যতম শক্তি অবশ্যই ব্যাটিং। যে কোন টার্গেটকে সফলভাবে নিয়মিত তাড়া করার যথেষ্ট শক্তি দলটির মধ্যে রয়েছে। পেস বোলিং বিভাগ অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং মিচেল স্টার্ক নির্ভর। ভালো ফিল্ডিং শক্তি আছে মাঠের সমস্ত অবস্থানে। তবে মিচেল স্টার্কের চোট সমস্যা কোহলী-ভিত্তরি কে চিন্তায় রাখবে।

এবার দেখে নিই কেমন হতে পারে দলটির সম্ভাব্য প্রথম একাদশ। গেইলের সাথে ওপেন করতে আসার সম্ভাবনা ওয়াটসনের। এতে দলের বোলিং শক্তি বাড়বে। তিনে অবশ্যই বিরাট কোহলী আসবেন। হয়তো উইকেটরক্ষকের দায়িত্ব সামলাবেন এবি। পাঁচ এবং ছয়ে আসবে তরুন তুর্কী রা, যথাক্রমে মনদীপ এবং সরফরাজ। এরপর চতুর্থ বিদেশি হিসেবে উইজা খেলতে পারেন। তবে অবশ্যই ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী এই জায়গায় মিচেল বা বদ্রি-ও খেলতে পারেন। বোলারদের পালা এরপর। বিনির অন্তর্ভুক্তি লোয়ার অর্ডারে ব্যাটিং শক্তি বাড়াবে। হর্শাল এবং অ্যারন সম্ভবত প্রাথমিক কিছু ম্যাচে দলে থাকবেন। সাফল্য না এলে তাদের বদলি কিন্তু রিজার্ভবেঞ্চে তৈরি থাকবে। এবং শেষে অবশ্যই ধারাবাহিক ভাবে পারফর্ম করা যজুবেন্দ্র চাহাল।

তবে তারকাখচিত দল হওয়ায় প্রথম একাদশের বদলও দেখা যেতে পারে।পরিস্থিতি অনুযায়ী দলগঠনই এবার এদের মূলমন্ত্র এবং সেইরকম বিকল্পও দলটিতে প্রচুর রয়েছে। ক্ষমতা অনুযায়ী খেলতে পারলে ব্যাঙ্গালোরকে হয়তো আমরা এবার ফাইনালে দেখবো। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা  এবং চ্যাম্পিয়নশিপের যোগ্য দল হিসেবেই অভিযান শুরু করবে এবারের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর।

~ অনিরুদ্ধ দাস

ছবি সৌজন্যেঃ sportsmanch.com

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s