টুকটাক তুকতাক

কথায় আছে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।একদম খাঁটি কথা। আর যদি বস্তু মেলার আকাঙ্খা হয় প্রবল, তাহলে মানুষ সূর্য পশ্চিমে ওঠে বিশ্বাস করতেও রাজি। ‘বিশ্বাস’ পদবীধারীরা মার্জনা করবেন প্লিজ, তবে এই লেখাটার লিড রোলে তাঁরাই আছেন যাঁরা মোটামুটি বিশ্বাসী বলে পরিচিত- অন্তত গঙ্গাজলের পবিত্রতায় না হলেও, বেড়াল কাটলে দাঁড়িয়ে যাওয়াটা কর্তব্য মনে করেন। বাঙালির ধর্মের মধ্যে ক্রিকেট বেশ পরেরদিকেই আসবে কিন্তু সেটাকেও যদি একটা ধর্ম বলে ধরে নিই, তাহলে সেই ভক্তদের মধ্যে বিশ্বাসের বহর নেহাত কম নয়। খোদ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাই ধরুন! মঙ্গলচণ্ডীর ঘোষিত ভক্ত, বনেদি পরিবারের ছেলে। মীরাক্কেলে ফটিক পুরকাইত আসা অবধি যদি খেলে যেতে পারতেন, তাহলে আশা করতে দোষ নেই যে মীর কোনও না কোনওদিন দাদার জন্যও “মা-আ-আ-দুলি” বলে কয়েক কলি গেয়ে দিতেন।

শীত এলে যেমন বসন্ত আসবেই (অধুনা অনুপমসেবক সঙ্ঘ অবশ্য শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সবেতে বসন্তকেই ভরসা ঠাউরে থাকেন), তেমন দাদা এলে সচিনকে আসতেই হবে। শোনা যায়, সচিন নাকি ব্যাট করতে নামার আগে সবসময় বাঁ পায়ের প্যাডটা আগে পরতেন। অনেক প্লেয়ার আছেন, যারা প্যান্টে রুমাল ঝুলিয়ে খেলেন। আপাতভাবে নিতান্তই নিরামিষ ওই দৃশ্য দেখে আমরা অভ্যস্ত, আজকাল পাড়া ক্রিকেটে দশ পকেটের জিনস্‌ পরে নামা ছোকরাও রুমালটা পিছন থেকে ওইভাবে ঝুলিয়ে রাখে। কিন্তু এতেও নাকি আছে নানা গল্প। যেমন স্টিভ ওয় বা জাহির খানের লাকি রুমাল। এছাড়া যুবরাজ সিংহের জন্মদিনের সঙ্গে মিলিয়ে জার্সি নম্বর রাখা বা সেওয়াগের নম্বরহীন জার্সি, দুয়ের পিছনেই নাকি জ্যোতিষশাস্ত্রের হাত আছে! সবচেয়ে হালের গল্প হল কলকাতা নাইট রাইডার্সের জার্সির রঙ বদল। শুরুর সেই আগুন ঝরানো সোনালি আর কালো কেকেআর জার্সি কোনও এক বিশিষ্ট সংখ্যাতত্ত্ববিদের পরামর্শে পত্রপাঠ বেগুনি করেন শাহরুখ! দেখলে ভক্তিশ্রদ্ধা খানিক চলে যেতে পারে (কালোর আভিজাত্যই আলাদা, সে বিএমডব্লিউ হোক বা কৃষ্ণকলি) কিন্তু কেকেআরের ঘরের লক্ষী এক্কেবারে অচলা।

আমরা বাঙালিরা বড়ই ধর্মভীরু জাত, সে কালীঘাটে জোড়াপাঁঠা মানত করাই হোক বা পাঁজি খুলে মন দিয়ে টিকটিকি পতনের ফলাফল পড়াই হোক। শোনা যায়, মাথায় টিকটিকি পড়লে রাজা হয়। এমন সুলভে রাজা হবার উপায় জানার পর আমার এক বন্ধু ঝাড়া এক ঘন্টা দেওয়ালে বসা একটা টিকটিকির নিচে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, যদি বাবাজি মাথায় এসে পড়েন। টিকটিকিও পড়ে না, বন্ধুও নড়ে না। বারতিনেক দেওয়ালে ঠোকাঠুকি করে হিতে বিপরীত হল, টিকটিকি গিয়ে সেঁধোলেন টিউবলাইটের তলায়। কয়েকবার টিউবটা জ্বালানো-নেভানো হল, তাতে টিউব গেল বিগড়ে, কিন্তু টিকটিকিটার মোটেও পড়ার ইচ্ছে হল না। শেষটায় যখন বোঝানো হল যে ব্যাপারটা আকস্মিক হলেই ভাল, রাজা তাড়াতাড়ি হওয়া যায়, তখন সে রণে ভঙ্গ দিল।

ইনি নিঃসন্দেহে ইউনিক, এবিপি আনন্দের সেরা বাঙালি হবার যোগ্য। কিন্তু এইরকম ইউনিক মানুষও খুব কম আছে বলে তো মনে হয়না। একবার খেলা চলছে, যদ্দুর মনে পড়ে লাহোর টেস্ট, সালটা ২০০৬। পাকিস্তান ব্যাট করছে। তখন আমাদের বাড়িতে কেব্‌ল লাইন ছিল না, আমি গেছি পাড়ার এক কাকুর বাড়িতে খেলা দেখতে। তিনি ঘোর ভারতীয়, পাকিস্তানের কাছে হার সইতে পারার চেয়ে জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করা তাঁর কাছে ঢের গ্রহণযোগ্য। আজকের দিনে হলে অ্যাসেম্বলি সিটে বিজেপির টিকিট-ফিকিটও পেয়ে যেতেন। এদিকে পাকিস্তান ব্যাটে ভালই খেলছে, শুরুতে শোয়েব মালিক আর ইউনিস খান জমিয়ে দিয়েছেন। তখন ক্রিকেট মানেই এমন ধুমধড়াক্কা হাঁকানো ছিল না, টেস্টে ঠুকে ঠুকেই লোকে বড় ইনিংস নামিয়ে দিত। মালিকও ঠুকঠুক করে ব্যাট করছেন, অনেকেই বিরক্ত হয়ে গেছে। কাকুর এমন সময় একটু তেষ্টা পেল। আর যেই না জগ থেকে এক গ্লাস জল গড়িয়ে চুমুক মেরেছেন, অমনি পাঠানের বলে ক্যাচ তুলে মালিক আউট। ব্যাস, আর যায় কোথায়! কাকুর স্থির বিশ্বাস, তিনি জল না খেলে পাঠানের চোদ্দপুরুষের সাধ্যি ছিল না মালিককে সরায়! এরপর সারাদিন প্রতি ওভারের শুরুতে কাকু এক ঢোক করে জল খেতে লাগলেন। জল খেয়ে খেয়ে পেট ফুলে গেল, বাথরুম গিয়ে গিয়ে হাঁপিয়ে গেলেন, তবু জল খাওয়াটা ছাড়লেন না। পরের উইকেট পড়েছিল পরেরদিন, ইউনিস খান আর ইউসুফ দুজনেই ফাটিয়ে ব্যাট করেছিলেন। আচ্ছা,কাকুর জল খাওয়াটা কি উলটে ওঁদের জন্য কোনওভাবে লাকি হয়ে গিয়েছিল?

অনেকেই আছেন, যাঁদের স্থির বিশ্বাস, তাঁরা খেলা দেখলে ভারত জীবনেও জিতবে না। মানুষের ওপর দেবত্ব আরোপ কম হয়নি, এই নিয়ে লোকায়ত দেবদেবীদের নানা পাঁচালিগান, ছড়া, কবিগানও আছে। কিন্তু কোনও পুরাণেই শনির কপালে শিকে ছেঁড়েনি। মানুষের ওপর দেবত্ব আরোপ বিরল নয় কিন্তু কেউ নিজেই নিজের ওপর শনিত্ব আরোপ করছেন, এটা শুনলে বড়ঠাকুরও নির্ঘাত চমকে যেতেন।  আমি কিন্তু দেখেছিলাম এমন একজনকে, যার শুধু খেলা না দেখা নয়, রীতিমত ঘরছাড়া হওয়া ছিল ভারতের পক্ষে লাক ফ্যাক্টর!

বারাসাতে থাকতাম তখন, একটা কলোনিতে। সেখানেই প্রতিবেশী এক যুবকের নাম ছিল মুলো। ভাল নাম চিরকেলে নিয়মেই কালের গর্ভে হারিয়ে যায়, শুধু কালজয়ী হতে পারে এই নামগুলো।তা এই মুলো এবং তার ভাই গাজর, দুজনেই ছিল শনির সাক্ষাৎ শাগরেদ। ফলে তার বাড়ির লোক ফতোয়া দিল, যতক্ষণ ভারতের খেলা হবে, ততক্ষণ তোমরা বাড়িতে থাকতে পারবে না। তারা কিন্তু ব্যাপারটা বেশ মেনেও নিয়েছিল। অতএব ভারতের ম্যাচ চললেই মুলোদের বাড়ির সামনের পরিচিত দৃশ্য, ভেতর থেকে গাঁক গাঁক করে ভেসে আসছে টিভির আওয়াজ আর বাইরে পায়চারি করতে করতে মুলো-গাজরের মিনিটে মিনিটে চিৎকার, “কিরে, কত হল?”

একবার কি একটা ম্যাচ চলার সময় মুলোকে প্রকৃতি ছোট্ট করে একবার ডাক দেন। তাতে সাড়া দিয়ে মুলো ভেতরে যায়। কাজটা অন্যায় ছিল না, ধর্মঘটের সময়েও অ্যাম্বুল্যান্সকে ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু হবি তো হ, মুলো চৌকাঠ ডিঙোতেই পটাং করে ভারতের একটা উইকেট পড়ে গেল। তারপর থেকে মুলোর জন্য কোনও এমারজেন্সি কোটাও বরাদ্দ হয়নি। নিজের দোতলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বাড়ির মালিক পাশের ড্রেনে জলবিয়োগ করছে, এই বিরল দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য সেকালে ওপাড়ার অনেকেরই হয়েছে। একটু বড় ডাক এলে পাশের বাড়িতে ছুটতে হত কিনা, সেটা অবশ্য জানা যায়নি।

তুকতাকের সবচেয়ে সরেস দুটি গল্প অবশ্য শোনা যায় তিরাশির কাপ ফাইনালে ভারতের জয়ের পিছনে। এক, ড্রেসিংরুম। লর্ডসে দুটি ড্রেসিংরুম আছে, তার একটা ড্রেসিংরুম আগের দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়েছিল ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বলা হয় তৃতীয়বার ওই ড্রেসিংরুম ভারত কব্জা করে নেওয়াতেই সেবার লর্ডসের ব্যালকনিতে ট্রফি হাতে লয়েডের আর দাঁড়ানোর সৌভাগ্য হয়নি। দুই, ফোটোগ্রাফার। আগের দুই বিশ্বকাপেই ফাইনালের আগে একজন ফোটোগ্রাফারকে দিয়ে একটা করে গ্রুপ ফোটো তুলিয়েছিলেন অধিনায়ক লয়েড। তিরাশির ফাইনালের আগে সেই ফোটোগ্রাফারকে আর পাওয়া যায়নি। কপিলদেবের নেওয়া ভিভ রিচার্ডসের ক্যাচ বা বলবিন্দর সিং সাঁধুর বিষাক্ত ইনকামিং যতই হাততালি কুড়োক, আজও নাকি গোপনে লয়েড ওই ফোটোগ্রাফারের জন্য মাঝেমাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন!

এগুলো যে সবসময় খেটে যায় তা নয়! কিন্তু ঢিল একবার লেগে গেলে মানুষকে ঢিল ছোঁড়া থেকে সরিয়ে আনা মুশকিল। ওই তিরাশির ফাইনাল দেখা নিয়েই বাবাদের মুখে গল্প শুনেছিলাম অনেক। এখানেও এরকম একটা তুকতাকের গল্প ছিল। বাবা তখন হাতিবাগানে থাকেন, একজন ধনী গৃহস্থর বাড়িতে টিভি, বাকিরা পাড়া-প্রতিবেশী মিলে দেখতে গেছে। ভারত প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে, সারা কলকাতা উত্তেজনায় ফুটছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টসে জিতে ফিল্ডিং নিল। এদিকে ভারতের ব্যাটিং এর বেহাল দশা, ১৮৩-তে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর কেউই আর ভাবেনি, এই স্কোর নিয়ে ভারত তৎকালীন দুর্ধর্ষ টিম ওয়েস্ট ইন্ডিজের মহড়া নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। শুরু হল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস। ব্যাটে গর্ডন গ্রিনিজ। এইসময় হঠাত কে যেন এসে ঘরের পাখার সুইচটা অফ করে দেয়। আর ঠিক সেই মুহুর্তেই বলবিন্দর সিং সাঁধুর সেই ঐতিহাসিক ডেলিভারিতে গ্রিনিজ বোল্ড হয়ে যান। সেই জুন মাসের ভ্যাপসা গরমে বাকি পুরো ম্যাচটা অতজন লোক একটা ঘরে বসে ঘামতে ঘামতে দেখেছিল। কেউ পাখা চালাতে দেয়নি। বাকিটা তো ইতিহাস!

shepherd
photo source: dailymail.co.uk

এরকম বহু কুসংস্কার, তুকতাক ইত্যাদি অঙ্গ হয়ে গেছে ক্রিকেটের। আইপিএলের অনেক খেলাতেই আজকাল দুটো টিম খেলছে বলে মনেই হয় না, নীল জার্সির আধিক্য দেখে। শুরুতে এরকম ছিল না, বিশেষ করে ডেকান চার্জার্সের জার্সিটা ছিল বিশেষভাবে চোখ টানত। কিন্তু তারাও এই সংখ্যাতত্ত্বের কবলে পড়ে নীল জার্সিতে শিফট করে যায়। এছাড়াও ক্রিকেটে নেলসনের কথা তো অনেকেই জানে। ফেসবুকে আমাদের সবার এক অতি পরিচিত একজন আছেন, যিনি যে টিমকে সাপোর্ট দেন, তার হার নাকি নিশ্চিত! এই গুজবটার দৌড় এতদূর যে, ভদ্রলোক পাঁড় মোহনবাগান সমর্থক হয়েও ডার্বির আগে প্রোফাইল পিকচারে ইস্টবেঙ্গলের লোগো সেঁটে দেন। শেষ করি একটা হালের উদাহরণ দিয়ে। মোহালির মহারণ! ভারতের ব্যাটিং শুরুর দিকে খানিক দেখে আমার মা একটা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যখন তাঁর কাজ শেষ হয়, তখন যুবরাজ খোঁড়াচ্ছেন, খোঁড়াচ্ছে ভারতের আপামর ব্যাটিং-ই। এদিকে মা এসে বসলেন আর যুবি আউট হল। তারপরের ঘটনা তো সবার জানা। সেই মহাকাব্যিক জয়ের পর মায়ের প্রথম ঘোষণা, আগামী ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে তিনি ভারতের ব্যাটিং চলাকালীন আগাগোড়া বসে থাকবেন, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও কেউ তাঁকে টলাতে পারবে না। বিধি বাম, দুপুরে বিবেকানন্দ রোড ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ায় কারুরই আর খেলার দিকে মন ছিল না, টিভিতে বিভিন্ন চ্যানেলে রেসকিউ অপারেশনে চোখ রাখার ফাঁকে মাঝে মাঝে স্কোর দেখে নিচ্ছিলাম জাস্ট! তারপর ম্যাচের রেজাল্ট তো সবারই জানা!

এই সব টুকরো-টাকরা মজাদার ঘটনা আজ আমাদের ক্রিকেট-যাপনের অঙ্গ হয়ে গেছে। এসবের পিছনে যুক্তির কোনও জায়গাই নেই, বলাই বাহুল্য। কিন্তু এইগুলো আছে বলেই হয়ত আরও বেশি করে ভারতে ক্রিকেট নামক ধর্মের জনপ্রিয়তা টের পাওয়া যায়। এখানে কিন্তু ধর্ম মানে হানাহানি-খুনোখুনি বা ভেদাভেদ না, ধর্ম মানে, যাকে রাধাকৃষ্ণন বলেছিলেন, ‘ওয়ে অফ লাইফ’। একটা বেঁচে থাকার, এই বিচ্ছিরি সময়েও ক্রিকেটকে আশ্রয় করে খানিক নির্মল আনন্দে   সব ভুলে থাকার উপায়। যে ধর্মের জোরে পাশের বাড়ির বৌদিও বলে উঠতে পারেন, ‘আহা, আমি ঠিক ওই সময়ে সোফা থেকে না উঠলে কি আর তোদের কোহলির সেঞ্চুরিটা হত?”

~ সৌরদীপ চট্টোপাধ্যায়

ছবি সৌজন্যেঃ espncricinfo.com

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s