দাঙ্গা, উদ্বাস্তু, ক্রিকেট, কলকাতা আর ভারতের টুকরোগুলো

ইতিহাস ভুল করে। বর্তমান আমাদের সুযোগ দেয় ভুল শুধরে নেওয়ার। ভবিষ্যৎ ঠিক-ভুলের তফাত বুঝিয়ে দেয়। স্বাধীন হওয়ার কিছু আগে এই দেশের মানুষ বড় ভুল করেছিল। ধর্ম কে সামনে রেখে কেটে ফালাফালা করেছিল এই দেশকে। মানুষের জন্য? নাকি ক্ষমতার জন্য? এই কলকাতা সাক্ষী সেই ভয়ংকর অস্থির সময়টার। ব্রিটিশদের জুরি হিসেবে খাড়া করে, জিন্না, সুরাবর্দি, নেহরু, শ্যামাপ্রসাদ প্রমুখরা নিজেদের মতবাদের কাছে দায়বদ্ধ থেকে নির্ধারিত করছিলেন কে  বাংলা নামের পিঠের কতটা ভাগ পাবে।

এই জটিল সময়ে কংগ্রেস এবং ব্রিটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রুষ্ট জিন্না, যার মুসলিম লীগ দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে আগেই তুলে রেখেছিল পাকিস্তানের দাবী, ঘোষনা করলেন ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র। ঘোষণা অনুযায়ী কর্মসূচি ছিল মূলত হরতাল, মিছিল আর জনসমাবেশের। দিন ঠিক হল ১৬ অগস্ট, ১৯৪৬। সেইদিনটা কলকাতাবাসীর কাছে এক ভয়ংকর দিন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে রইল। অক্টারলোনি মনুমেন্ট এর নিচের সমাবেশ ভাঙ্গতেই সমাবেশে অংশ নেওয়া বিপুল সংখ্যক মুসলিম চড়াও হলেন হিন্দু পথচারী এবং বিভিন্ন দোকানের ওপর। কিছু পরে হিন্দুরা একজোট হয়ে পাল্টা আঘাত হানলেন মুসলিমদের ওপর। শুরু হোল ভয়ংকর দাঙ্গা। লাগাতার চলল মার এবং তার জবাবে পাল্টা মার। দাঙ্গা যত বাড়ল, মৃত এবং আহতদের মধ্যে মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল। কলকাতার রাস্তা ভরে গেল মৃতদেহে। শহরের আকাশ ভরে গেল লোভী শকুনের আনাগোনায়। সেই মন্বন্তরের পর এত নরদেহ বহুদিন তাদের জোটেনি এ তল্লাটে। দাঙ্গা থামাতে বৃদ্ধ গান্ধীজি এলেন কলকাতায়। কলকাতায় ১৯৪৬ এর অগস্টের ওই কদিন প্রায় নিশ্চিত করে দিল দুটো জিনিস- দেশভাগ তো হবেই, বাংলাও টুকরো হবে।

rarenewspapers.com
photo source: rarenewspapers.com

দেশ ভাগ হল। ক্রিকেট দল ভাগ হল। কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে প্রথম টেস্ট ম্যাচ হয় ১৯৩৪-এ। সেটা ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে তৃতীয় টেস্ট, দেশের মাটিতে দ্বিতীয়। সেই দলে ছিলেন নাউমল মাখিজা, ওনার জন্ম করাচিতে। ছিলেন দিলওয়ার হুসেন, জন্ম আর মৃত্যু দুইই লাহোরে। খেলেছিলেন সঈদ ওয়াজির আলী, জন্ম জলন্ধরে, মৃত্যু করাচীতে। ছিলেন বিখ্যাত পেস বোলার মহম্মদ নিসার, যিনি জন্মেছিলেন হোসিয়ারপুরে যা এখন ভারতে। ওনার মৃত্যু হয় পাকিস্তান এর লাহোরে। এই মানুষগুলোর জন্ম বা মৃত্যু অথবা দুইয়ের শহরই অধুনা পাকিস্তানে, কিন্তু এদের সবার টেস্ট খেলোয়াড় হিসেবে নামের সঙ্গে ভারত নামটা জুড়ে গেছে। দেশ ভাগ এরকম অনেক কিছুই পালটে দিল। বহু মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে সীমানার অন্যপারে চলে যেতে বাধ্য হলেন। এত বিদ্বেষ নিয়ে দেশ ভাগের পরেও স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তান তাদের প্রথম টেস্ট সিরিজ খেলল সেই ভারতের বিরুদ্ধে, আর সেই সিরিজ এর শেষ ম্যাচ হল এই কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে, ১৯৫২ সালে। ইডেনে সেই টেস্টে দুই দলেই এমন কিছু খেলোয়াড় ছিলেন যাদের জন্মস্থান আর তখন তাদের প্রতিনিধিত্ব করা দেশ আলাদা। পাকিস্তানের ‘লিটল মাস্টার’ হানিফ মহম্মদ জন্মেছিলেন জুনাগড়ে। এই জুনাগড় দেশভাগ এর ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য চ্যাপ্টার।ভারত এবং পাকিস্তান, দুই দিকের মধ্যেই জুনাগড় প্রভিন্স নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া চলে দীর্ঘ সময় এবং শেষে জুনাগড় আসে ভারতে। ঐতিহাসিকেরা বলেন যে এই জুনাগড় হাতছাড়া হওয়ার জ্বালা মেটাতেই পাকিস্তান কাশ্মীর নিয়ে ভীষণ একরোখা হয়ে যায়। আবার ওই ম্যাচে ভারতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করা ক্রিকেটার গুলাবরাই রামচন্দ এর জন্ম হয়েছিল অবিভক্ত ভারতের করাচি তে। ওই ইডেন টেস্টে ভারতীয় দলের উইকেটকিপার ছিলেন প্রবীর কুমার সেন যিনি ময়দান ক্রিকেট মহলে খোকন সেন নামেই সুপরিচিত। খোকন সেন এর জন্ম অবিভক্ত ভারতের কুমিল্লায়। ইডেন টেস্টের সময় যে কুমিল্লা ছিল পাকিস্তানের অংশ। খোকন সেনের মৃত্যুর (২৭ জানুয়ারী, ১৯৭০) প্রায় দুই বছর পর কুমিল্লা স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হয়। দেশভাগ ঠিক এইভাবেই জটিল করে দিয়েছিলো অনেকের জীবনকাহিনী।

পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরির পর পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অত্যাচার কিন্তু কমল না। লাখলাখ উদ্বাস্তু মানুষ সবটকু হারিয়ে শুধু প্রাণ সম্বল করে চলে আসতে লাগল ভারতে। কলকাতা ভরে গেল ভিটেমাটি হারা ভয়ার্ত মানুষে। মন্বন্তরের বুভুক্ষু মানুষ, দাঙ্গায় বিপর্যস্ত মানুষ, দেশভাগে  ভিটেহারা মানুষ, শহরটা কিন্তু নীলকন্ঠ হয়ে সয়ে নিল সবটা। ওদিকে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হল আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। লড়াই প্রথমে শুরু হয়েছিল বাংলা ভাষার অধিকারের দাবিতে এবং ক্রমে তা রূপান্তরিত হল স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে। নিপীড়ন যত বাড়ল, বাড়ল আন্দোলন আর তত মানুষ আসতে লাগলেন এইদেশে। পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় শহর কলকাতা আর সংলগ্ন এলাকা বাসস্থান হয়ে উঠতে লাগল কয়েক লক্ষ অসহায় আর উদ্বাস্তু মানুষের।ক্রমে ভারত সরকার আর কেজিবির মদতে আন্দোলন হল আরও জোরদার এবং সশস্ত্র, শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে পাকিস্তান টুকরো হয়ে জন্ম হল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।

তারপর একসময় বাংলাদেশ তার ক্রিকেট দল গড়ল। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরির পর তারা ইডেন গার্ডেনসে একটাই আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে, ১৯৯০-এর এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে।কিন্তু এই ৪৫ বছরে পাকিস্তান আর বাংলাদেশ কখনো এই দেশের মাটিতে নিজেদের মুখোমুখি হয়নি কোনও ক্রিকেট ম্যাচে। বাংলাদেশ গ্রুপ এ তে জেতার ফলে যা হতে চলেছে প্রথমবার এই ইডেনে আজকে, ১৬ই মার্চে। আর ১৯শে মার্চ ভারত মুখোমুখি হবে পাকিস্তানের, আর এর কারণ ধর্মশালা। চিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিব্বতিদের বিদ্রোহের পর যখন চিনের সেনাবাহিনী আক্রমণ করে তিব্বতের রাজধানী লাসা, তখন প্রায় পনেরো দিনের কঠিন পথ পেরিয়ে চতুর্দশ দলাই লামা এসে ঠাঁই পান এই পাহাড় ঘেরা ধর্মশালা শহরে, সেটা ১৯৫৯। আজও দলাই লামা রয়ে গেছেন এই ধর্মশালাতেই। আর সেই শহরের মানুষ চায়নি যে ২০১৬ বিশ্ব টি—২০র পাকিস্তানের নির্ধারিত খেলাগুলো ধর্মশালার ক্রিকেট মাঠে হোক। কারণ পাকিস্তান আর সে দেশের সমস্ত মানুষকে তারা শত্রু বলে মনে করে যাদের নাকি খেলারও অধিকার নেই এই দেশে। ধর্ম, রাজনীতি সব জোট বেঁধে এভাবেই আটকে দিতে চেয়েছিল ক্রিকেটকে। এই টালমাটাল অবস্থায় পাকিস্তান এর খেলা চলে এলো ইডেন গার্ডেনসে। সেই মাঠে যেখানে ১৯৯৯ এর পাকিস্তান ভারতের টেস্ট খেলা শেষ করার জন্য মাঠ খালি করতে হয়েছিল। সে কলকাতার ক্রিকেটের গায়ে এক বড় কলঙ্কের দাগ। দর্শকদের তাণ্ডবে ইডেন কলঙ্কিত হয়েছে বারবার। ১৯৬৭-র জানুয়ারীতে ওয়েস্ট ইন্ডিসের  বিরুদ্ধে ইডেন টেস্টে দর্শক আর পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে মাঠে আক্ষরিক অর্থে আগুন জ্বলেছে। ১৯৬৯-এ অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলায় শেষ দিন মাঠে দর্শক হাঙ্গামায় অনেকক্ষণ বন্ধ রাখতে হয়েছে খেলা। ১৯৯৬-এর বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল শেষ করা যায়নি দর্শক অশান্তির কারণে। ইতিহাসে ভুল হয়েছে, বর্তমান আবার সুযোগ এনে দিয়েছে সেই ভুল শুধরে নেওয়ার। এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছে কলকাতা। যে শহর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র রক্তের দাগে কলঙ্কিত হয়েছে, দেশভাগকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে, যে শহরে বুক ভাঙ্গা কান্না নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বাংলার পুব দিক থেকে এসে জড়ো হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ, সেই শহরই আজ জায়গা করে দিল সেই দুটো দেশকে খেলার, যারা ধর্ম, ভাষা, রাজনীতির নামে টুকরো হয়েছে। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থেকেও যাদের মধ্যে থেকে গেছে এক দুর্লঙ্ঘ্য পাঁচিল। ইডেনে এই জায়গা করে দেওয়ার মধ্যেও কি রাজনীতি নেই? ক্ষমতার লড়াই নেই? নিশ্চয়ই আছে।কলকাতার মন এত বড় হলে তো তসলিমাকে এ শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়না।  দেশভাগ আমাদের বাঙ্গালির ইতিহাসে এক দুরপনেয় লজ্জা আর যন্ত্রণার অধ্যায়। তাকে ভুলে যাওয়া নিশ্চয়ই অন্যায়। কিন্তু বৈরিতার, হিংসার,বদলার যে বীজ রোপণ করা হয়েছিল ১৯৪৬ এর ১৬ অগস্ট কলকাতার বুকে, তাকে শেষ করে দেওয়া যায় চিরতরে। এই ইডেন গার্ডেনসের সামনেই ওই অক্টারলোনি মনুমেন্ট যেখানে  সমাবেশ এর পর শুরু হয়েছিল দাঙ্গা। এই ইডেন গার্ডেনস থেকে বেশি দূরে নয় ওই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড যেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ রাস্ট্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে এসে প্রায় দশ লাখ মানুষের বিপুল জনসমাবেশে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন ভারতের মানুষদের আর কড়া শ্লেষে বিদ্ধ করেছিলেন পাকিস্তান এর শাসকদের। সেই ইডেনেই বিশ্ব টি-২০র জন্য মুখোমুখি হবে এই তিনটে দেশ যারা আলাদা হয়েও তাদের মানুষগুলো জীবনযাত্রায়, খাদ্যাভ্যাসে, গানবাজনায় ভীষণ রকম ভাবে এক। ১৬ মার্চ এর বাংলাদেশ-পাকিস্তান আর ১৯ মার্চ এর ভারত-পাকিস্তান খেলায় কে জিতবে জানি না, শুধু এ শহরটা যেন না হারে। একটা ভালো ‘মওকা’ পাওয়া গেছে অনেক লজ্জার দাগকে পুরোপুরি মুছে দেবার। এবার সেটা হারানো চলবে না। কিছুতেই না।

যেই হারুক, যেই জিতুক।

~ অর্ঘ্য লাহিড়ী

ছবি সৌজন্যেঃ siasat.com

Advertisements

One thought on “দাঙ্গা, উদ্বাস্তু, ক্রিকেট, কলকাতা আর ভারতের টুকরোগুলো

  1. Darun likhechis…sotti onekdin por kono bhalo lekha porlam…hitihas ke bartoman er prekhapote dar koriye sundor bishleson…’1st Atom Bomb’ er ekta line mone pore jache…’what was the reality of yesterday and what is the reality of today’…

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s