লিপ ইয়ার দিবসের মির‍্যাকল

লিপ ইয়ার ব্যাপারটাই বেশ আকর্ষনীয়। প্রতি চার বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে অতিরিক্ত গোটা একটা দিন। কেউ কেউ দিনটা ছুটি নিয়ে কাটিয়ে দেয়, কেউ আবার বছরের ঐ অতিরিক্ত দিনটাতেও কাজ থেকে বিশ্রাম নেয় না।

২৯ ফেব্রুয়ারির সঙ্গে ক্রিকেটের খুব বেশী যোগাযোগ না থাকলেও বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম এক অঘটনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দিনটা।

সালটা ১৯৯৬। সাতাশির পর আবার বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফিরে এসেছে ভারতীয় উপমহাদেশে। ভারত, পাকিস্তানের সঙ্গে এবার খেলা পড়েছে শ্রীলঙ্কাতেও। যদিও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শ্রীলঙ্কা যেতে অস্বীকার করল অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এমনকি ভারত-পাকিস্তান যৌথ একাদশের ক্রিকেট ম্যাচও তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারল না।

ঐটুকু খুঁত থাকলেও বিশ্বকাপের প্রথম থেকেই উৎসাহের ঘাটতি ছিল না। ততদিনে স্যাটালাইট টিভি চ্যানেলগুলোর দৌলতে ক্রিকেট ভারত-পাকিস্তানের অলিতে-গলিতে তো বটেই এমনকি বোধ হয় রান্নাঘরেও ঢুকে পড়েছে। আর বিশ্বকাপ মানেই হাইপের চূড়ান্ত! একের পর এক স্পনসরদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল ব্রান্ডের ছায়াযুদ্ধ।

যোগদানকারী দেশের সংখ্যার দিক দিয়েও ছিয়ানব্বইয়ের বিশ্বকাপ ছিল সেই সময়ের বৃহত্তম। যে নটা দেশ টেস্ট খেলে সেগুলো ছাড়াও ১৯৯৪-এর আইসিসি ট্রফির রেজাল্টের ভিত্তিতে যোগ দিয়েছিল আরব আমিরসাহী, কেনিয়া আর নেদারল্যান্ডস। মোট বারো দেশের টুর্নামেন্টে দলগুলোকে ভাগ করা হয়েছিল দুটো গ্রুপে।

২৯ ফেব্রুয়ারি পুনের নেহেরু স্টেডিয়ামে এ-গ্রুপের দশম ম্যাচে মুখোমুখি হল ১৯৭৫ আর ১৯৭৯-এর চ্যাম্পিয়ান ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর ক্রিকেট কৌল্যিনের বিচারে সদ্যজাত কেনিয়া! ফলাফল কী হতে পারে জানাই ছিল। এমনকি বুকিদের খাতাতেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনেকটাই এগিয়ে ছিল কেনিয়ার চেয়ে।

যদিও এই বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ খুব সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল না। প্রথম ম্যাচে জিম্বাবোয়েকে হারালেও ভারতের কাছে হেরে এবং শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে না খেলে বেশ চাপেই ছিল তারা। শেষ দুটো ম্যাচের অন্তত একটা জিততেই হত তাদের। কেনিয়া অবশ্য তাদের প্রথম তিনটে ম্যাচেই হেরেছিল। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় আর খেলার শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সুপারস্টারদের সঙ্গে কিছু ছবি তোলা!

আর হবে নাই বা কেন? ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সেই আশির দশকের মত ধার না থাকলেও যারা ছিলেন তাঁরাও সামান্য কেউ নয়। বোলিং বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন ওয়ালশ, অ্যামব্রোজ, বিশপ। ব্যাটিংয়ের হাল ধরেছিলেন অধিনায়ক রিচি রিচার্ডসন, শিবনারায়ন চন্দ্রপল, জিমি অ্যাডামস এবং অবশ্যই ব্রায়ান লারা! শচীন এবং লারার দ্বৈরথ ততদিনে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়মিত তর্কের বিষয়।

অন্যদিকে স্টিভ টিকোলো ছাড়া কেনিয়ার প্রায় পুরো দলটাই অপেশাদার। তবু তাদের মধ্যে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় বলতে ছিলেন অধিনায়ক মরিস ওদুম্বে, আসিফ করিম, কেনেডি ওটিয়ানোরা।

খেলার শুরুটা কেনিয়ার জন্য খুব একটা আশাব্যঞ্জক হয়নি। টসে জিতে রিচার্ডসন কেনিয়াকে ব্যাট করতে পাঠালে ওয়ালশ নিজের প্রথম স্পেলেই কেনিয়ার প্রথম তিনজন ব্যাটসম্যানকে তুলে নেন। বোর্ডে রান তখন মাত্র ৪৫। টিকোলোর ২৯ রান সত্ত্বেও মিডল অর্ডার খুব বেশী কিছু করতে পারেনি। এক সময় পরিস্থিতি দাঁড়ায় ছয় উইকেটের বিনিময়ে ৮১ রান।

এরপর হিতেশ মোদির নেতৃত্বে কিছুটা রুখে দাঁড়ায় কেনিয়ার লোয়ার অর্ডার। মোদির ২৬, সতেরো বছর বয়সী টমাস ওডোয়োর ২৪, আসিফ করিমের ১১… এইভাবে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে ১৬৬ অবধি পৌঁছয় কেনিয়া। এ প্রসঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছন্নছাড়া বোলিং আর ফিল্ডিংয়ের কথাও বলতে হবে। ১৪টা ওয়াইড, ১৩টা নো বল মিলিয়ে মোট ৩৭ রান অতিরিক্ত দেয় তারা। কেনিয়ার ব্যাটিংয়ের সর্বোচ্চ স্কোরার শ্রীমান অতিরিক্তই ছিলেন। সঙ্গে বেশ কিছু ক্যাচও পড়ে।

কিন্তু তার পরেও মাত্র ১৬৬ রানের লক্ষ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে জলভাতই বলা চলে। এমনকি কেনিয়ার খেলোয়াড়রাও বিরতিতে বসে ভাবছিলেন যে, খেলা হয়তো তিরিশ ওভারের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। দু-একজন তো বোধহয় বিকেল বিকেল খেলার পর পুনের সাইট-সিইংয়ের প্ল্যানও বানিয়ে ফেলেছিলেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সাবধানে শুরু করেছিল। কিন্তু খেলার চতুর্থ ওভারে ক্যাপ্টেন রিচার্ডসন রাজাব আলির বলে প্লেড অন হয়ে যান। ব্রায়ান লারা নেমেই একটা চার মারলেও খেলা দেখেই মনে হচ্ছিল যে খুব একটা গা লাগিয়ে খেলছেন না। পরের ওভারে অন্য ওপেনার ক্যাম্পবেলও রাউন্ড দ্যা লেগস বোল্ড হওয়ার পর স্কোর দাঁড়ায় ২২ রানে দু উইকেট।

তৃতীয় উইকেট নিয়ে বলার আগে কেনিয়ার সেদিনের উইকেট কিপার তারিক ইকবালের কথা বলি। যদিও কেনিয়ার হয়ে প্রথম দিককার ম্যাচগুলোতে কেনেডি ওটিয়েনো কিপিং করছিলেন কিন্ত সেই খেলাগুলোতে ইকবাল খেলেননি। ইকবাল দলে ঢুকলে ওটিয়েনো কিপিংয়ের দায়িত্ত্বটা ওনার ওপরেই ছেড়ে দেন। একটু মোটাসোটা, চশমা চোখে ইকবালকে দেখে স্কুলের কড়া বিজ্ঞানের শিক্ষক মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইংল্যান্ডের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকা তাদের ম্যাচ রিপোর্টে ইকবাল সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে লিখেছিল  “bearded and bespectacled, wearing a blue headband and a double chin”।

সেদিন প্রথম থেকেই ইকবাল কিপিং করতে গিয়ে প্রচণ্ড নড়বড়ে ছিলেন। একের পর এক বল গলিয়ে ততক্ষণে তিনি দর্শকদের তো বটেই এমনকি নিজের দলের খেলোয়াড়দের কাছেও হাসির খোরাক। এরই মধ্যে রাজাব আলির চতুর্থ ওভারের তৃতীয় বলে হালকা আউট সুইঙ্গারে ব্রায়ান লারার অসাবধানী কাট ব্যাটের কানায় লেগে ইকবালের কাছে গেলে কোন রকমে সেটাকে লুফে নেন তিনি! ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে এটা ছিল এক বিশাল ধাক্কা আর কেনিয়ানদের কাছে আশার আলো। তাঁর পরেই কিথ আর্থারটনের বেহিসেবী রানিং-বিটুইন-দ্যা-উইকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দাঁড় করিয়ে দেয় ৩৪/৪-এ।

129808
photo courtesy: espncricinfo.com

এরপর চন্দ্রপল আর জিমি অ্যাডামস একটা পার্টনারশিপ গড়ে তুলেছিলেন কিন্তু অধিনায়ক ওদুম্বে পরপর চন্দ্রপল, অ্যাডামস আর হার্পারকে তুলে নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আরো সমস্যার মধ্যে ফেলে দেন। ম্যাচের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর ১০-৩-১৫-৩ স্পেলের গুরুত্ব অসীম। ৩৩/৪ হয়ে যাওয়ার পরেও কিন্তু অনেকেই ভেবেছিলেন যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ অবধি ঠিক ম্যাচ বের করে দেবে। কিন্তু ওদুম্বের বোলিংয়ের দাপটে সেটার কোন সম্ভাবনাই ছিল না।

এরপর ম্যাচের আর বেশি কিছু বাকি ছিল না, কোর্টনি ওয়ালশকে একটা খুব খারাপ সিদ্ধান্তে আউট দিলেও ওই সময়ে ৮ উইকেটে ৮৯ রানে দাঁড়িয়ে সেটা ম্যাচে যে খুব একটা প্রভাব ফেলেছিল বলা যায় না।

শেষ অবধি ক্যামেরন কাফিকে বোল্ড করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসের ইতি টানেন সেই রাজাব আলি। শুরুতে রিচার্ডসন আর লারাকে আউট করে কেনিয়ার জয়যাত্রার সূচনা ইনিই করেছিলেন। রাজাবের সেদিনের বোলিং হিসেব ছিল ৭ ওভার ২ বলে ১৭ রানে ৩ উইকেট।

খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেনিয়ার খেলোয়াড়রা উৎসবে মেতে ওঠেন। পুনের মাঠ ভর্তি দর্শকের সামনে ভিক্ট্ররি ল্যাপ দিতে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা। সঠিক অর্থেই এটা ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসের এক অবিস্মরনীয় মুহূর্ত এবং একদিনের ক্রিকেটের এক অন্যতম অঘটন!

এই রেজাল্ট কেনিয়ার ক্রিকেটকে খুব একটা প্রভাবিত না করলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। সবার প্রথমেই আঙ্গুল ওঠে অধিনায়ক রিচি রিচার্ডসনের দিকে। রিচার্ডসন নিজেও সেদিন বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন।  “I have no words right now.” এর চেয়ে বেশী কিছু বলতেও পারেননি তিনি। যদিও পিটার রোবাকের মত কয়েকজন অভিজ্ঞ ক্রিকেট সাংবাদিক তাঁদের ম্যাচ রিপোর্টে উল্লেখ করেন লারার দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ের কথা। তবে অধিকাংশ ক্যারিবিয়ান সাংবাদিকদের ম্যাচ রিপোর্টেই ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের মৃত্যুঘন্টার নির্ঘোষ।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগেই নিজের অবসর ঘোষণা করেন রিচার্ডসন। যদিও গ্রুপ লিগের শেষ খেলায় অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত নক-আউটে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রায়ান লারার অসামান্য ইনিংসের ওপর ভর দিয়ে সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠলেও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াইয়ের পর মাত্র ৫ রানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় তারা। এর পর থেকে আজ পর্যন্ত আর কোন বিশ্বকাপেই সেমি ফাইনাল অবধি পৌঁছতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল।

~তপোব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি সৌজন্যেঃ www.alloutcricket.com

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s