দেশ দেশ খেলা

সালটা বোধহয় ১৯৯২। টিন এজে ঢুকব ঢুকব করছি, সবে ক্রিকেট নামক বিজাতীয় ধরপাকড় খেলায় মন লেগেছে। সেই সময়েই লেগে গেল, হই হই করে বিশ্বকাপ! আমাদের বাড়ীতে টি,ভি ছিল না, ওই সময় সবার বাড়ীতে থাকত না, আর টি ভি দেখায় ঘন ঘোর রেশনিং ও সেন্সরিং চলত। কার্টুনের পাশাপাশি যে জিনিসটা দেখতে মোটে সেন্সরিং ছিল না, সেটা হল ক্রিকেট। টি ভি দেখার জায়গা ছিল মাসীর বাড়ি, সে বাড়ীতে মেসো ও দিদি ক্রিকেট পাগল। আমার মাও ক্রিকেটে বেশ উৎসাহী। অতএব শুরু হয়ে গেল ক্রিকেট এ আমার ছোট্ট নাকটা গলানোর চেষ্টা।

বেশী বুঝিনা, কিন্তু চট করে বুঝে নিলাম, ‘আমাদের’ টিম হল ভারত, আর ‘আমাদের’ ক্যাপ্টেন হলেন মহম্মদ আজহারউদ্দীন। মুশকিল হল ভদ্রলোক কি যে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন তেমন বুঝতে পারিনা। তা যাক, খবরের কাগজে তো লিখেই দিচ্ছে সব। আর তাছাড়া আছে  আনন্দমেলা, তারা আবার খবরের পাশাপাশি একটা করে রঙচঙে পোস্টার দিচ্ছে ক্রিকেটারদের, আর বই আসা মাত্র দিদি সেই পোস্টার ঘরে সাঁটিয়ে ফেলছে। কত লোকের নাম জেনে গেলাম টুক করে, অ্যালান  বর্ডার, ও তো অস্ট্রেলিয়ান, কেমন সোনালী চুল, ইয়ান বোথাম, নীল চোখের ইংরেজ, আরো কত কী। কিন্তু মুশকিল হল, যাদের দেখতে আমার চোখে সব চেয়ে ভালো লাগে, তারা আবার আমাদের ‘শত্রু’ টীমে। হ্যাঁ, আর কিছু বুঝি না বুঝি, এইটুকু বুঝে নিয়েছিলাম, যে পাকিস্তান মানেই শত্রু।

তা সেদিন ভারত বনাম পাকিস্তান খেলা, চারদিকে সকাল থেকে সাজসাজো রব, সবাই বলছে ‘ওদের’ হারাতেই হবে। আমিও বেজায় উত্তেজিত, এবং চিন্তিত, কি হবে যদি, আমরা হেরে যাই! হবি না হবি সেদিনই আনন্দমেলা এল, তাতে পাকিস্তানের ক্যাপ্টেন ইমরান খানের ছবি। আমি তো তখন সেই দেখে শেখার ষ্টেজ এ, দিদি কে দেখেছি, এই পোস্টার টাঙ্গাতে, তাহলে আমিই বা কম যাই কীসে!! টুক করে খুলে নিলাম পোস্টার, দেওয়ালে হাত পাইনা, তাই সবে খাটে চড়েছি, ওমা, দিদি এসে সেকী বকুনি! “আজ ইন্ডিয়া পাকিস্তান ম্যাচ, আর আজ তুই ইমরানের পোস্টার টাঙাচ্ছিস???” অনেক বকুনি খেয়ে বুঝলাম, আমি যে কান্ডটা করতে চলেছি, তা নেহাতই দেশদ্রোহ! বলে কী??? আমি দেশের শত্রু নাকী!!! চুলোয় যাক ইমরান খান, তোমাকে যতই সুন্দর দেখতে হোক বাবা, আমার দেশের সাথে নো চালাকি। ফলত, ইমরানের পোস্টারের উচ্চ স্থান থেকে পতন, ও আমার তাকে কুচি কুচি করে ছেঁড়া। পরে আবার সেই ইমরানের হাতে যখন বিশ্বকাপ  উঠল তখন দেখি কত লোক বলছে, যাক এশীয় দেশ কাপ তো পেয়েছে!!! ইকী রে বাবা, এ বেলা দেশদ্রোহ হল না????

এরপর সাল ১৯৯৬। এবার দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ। এইবার আমি আগের বারের থেকে কিঞ্চিত বেশী বুঝেছি ক্রিকেট মানে কি কী, এবং ঘরে শোভা পাচ্ছে অনিল কুম্বলের পোস্টার। এবারও আগের বারের মতই, সবাই বলল, আর কিছু হোক না হোক ‘ওদের’ হারাতেই হবে। যথারীতি নির্ধারিত দিনে টান টান উত্তেজনা, ‘আমরা’ জিতব তো? এর মধ্যে আমাকে রীতিমত থ্রেট দেওয়া হয়েছে, কুম্বলে যদি খারাপ খেলেন, এবং তাঁর ফলে ভারত হেরে যায়, তাহলে আমার পোস্টারদের বিসর্জন দেওয়া হবে। তা যাই হোক, দু একবার রক্তচাপ বাড়িয়ে কমিয়ে, ভারত শেষে জিতেই গেল। এবং জানা গেল যে এরপর ভারত বিশ্বকাপ না জিতলেও ক্ষতি নেই, ব্যাটা পাকিস্তানীগুলোকে তো হারানো গেছে। ওদিক থেকে খবর এল ম্যাচ হেরে পাকিস্তানী ক্রিকেটাররা দেশে ফিরতে পারছেন না, তাতে আমাদের দেশপ্রেমে উজ্জ্বল মুখে তির্যক হাসি ছাড়া কিচ্ছু দেখা গেল না।

কাট টু ১৯৯৯। সেবার বিলেতে বিশ্বকাপ। এবং, সেবার প্রেক্ষাপটে কার্গিলের যুদ্ধ। অর্থাৎ দেশপ্রেমের মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান বিদ্বেষ। জানা গেল, আর্মি যা করার তো করছেই, কিন্তু এখন দেশের মান সম্মান রক্ষার ভার শচীন, সৌরভ, কুম্বলে, প্রসাদদের উপরই। এবং সেবার, ভারত পাকিস্তানের ম্যাচ রিপোর্টে এক বিখ্যাত দৈনিক এর ততোধিক বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক পাকিস্তানের উইকেট পতনের সাথে দ্রাস ও বাটালিকে ভারতীয় সেনার বিজয় অভিযানের তুলনা করে ফেললেন, দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে। সাথে সাথে ধারাবিবরনী দেওয়া হল, কিভাবে ভারতীয় সেনারা উচ্ছাস প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রতিটি সাফল্যের মুহূর্তে।

এইভাবে প্রতিবার ভারত পাকিস্তান খেলা হয়, এবং আমরা দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিয়ে চলি। “জিতেগা ভাই জিতেগা হিন্দুস্তান জিতেগা” স্লোগান যখন পরিণত হয় “হিন্দুস্থান জিন্দাবাদ” ধ্বনিতে, তখন পাশাপাশি কিছু অতি উৎসাহী বলে ফেলেন “পাকিস্তান মুর্দাবাদ” আর আমরা স্নেহশীল চোখে তাদের দিকে তাকাই, ভাবি, আহা, নিজের দেশের প্রতি কি গভীর ভালোবাসা। কখনো কখনো শোনা যায়, দেশের ও শহরের কিছু বিশেষ অংশে পাকিস্তানী পতাকা উড়েছে খেলার সময়ে। তখনই চাপা স্বরে শোনা যায়, “ও দেশে গেলেই তো পারে, তা না এমন বেইমান…।” ও দেশেও একই জিনিস দেখা যায়। কোহলির ফ্যান নিজের বাড়ির ছাদে ভারতের পতাকা লাগানোর ভয়ঙ্কর ‘অপরাধে’ জেলে যান। আর এদেশে আমরা মুচকি হেসে বলি, “দেখেচো, আমরা কেমন সহিষ্ণু? অমুক অঞ্চলের লোকেদের কিন্তু আমরা জেলে দিইনা, দেশদ্রোহী ব্যাটারা পাকিস্তানের হয়ে গলা ফাটালেও না!”

~ সায়ন্তনী অধিকারী

ইমেজ  সৌজন্যে  :  www.pakistantoday.com.pk

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s